নজরুলের যুদ্ধে যাওয়া ও বিদ্রোহী কবিতার একশ’ বছর-ওচমান জাহাঙ্গীর

কাইজার নেদারল্যান্ডে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ভয়াবহ প্রথম মহাযুদ্ধ(১৯১৪-১৯১৮) শেষ হয়১৯১৮ নভেম্বর মাসের ১১ তারিখ।
পরের বছর১৯১৯ ফেব্রুয়ারী মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধরত ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হল। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ৩২নম্বর কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে উঠলেন।বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী বৃটিশ রা বিপুল পরিমাণ অর্থ খাদ্যশস্য ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভারত বর্ষ থেকে নিয়ে যেতে থাকে বিনিময় যুদ্ধশেষে ভারতবর্ষকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। ১৯১৯ সালের বিশ্ব যুদ্ধ জয়ের জন্য বৃটিশকে কংগ্রেসের অধিবেশনে অভিনন্দন জানানো হয়। কিন্তু স্বভাবসুলভ শঠতায় বৃটিশরা স্বায়ত্তশাসন দেয়ার পরিবর্তে রাওলাট আইন ও অন্যান্য দমনমূলক আইন এর করে অমানবিক অত্যাচার শুরু করলো মুক্তিকামী ভারতবর্ষের মানুষের ওপরে। কাজী নজরুল ইসলাম যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সব খবরই রেখেছিলেন এমনকি সেডিশন কমিটির রিপোর্টের অনুলিপিও সংগ্রহ করেছিলেন।

উল্লেখ্য যে এই উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার বিচারপতি রাউলাটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ‘সিডিশন কমিশন’ [Sedition Commission] গঠন করেন । ভারতীয়দের হিংসাত্মক আন্দোলন থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে কমিশন কতকগুলি সুপারিশ করেন।
তিনি যুদ্ধে যাওয়ার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল তার রাজনীতির প্রকৃত যোগ্য পাত্র হওয়া,বৃটিশ থেকে ভারত মুক্ত করা।

৪৯ তম ব্যারাকে বাঙ্গালী সৈন্যদের প্রতি বৃটিশ কর্তৃপক্ষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল যে কোনো রকমের রাজনীতিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল অতি কঠোর ব্যবস্থা নজরুলের নিকটে সব ই হার মেনেছিল এমন সব গোপন পথ খুলে ছিল যার সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে নিষিদ্ধ পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা অবলীলাক্রমে ব্যারাকে প্রবেশ করতে পারে। সরকারি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কাজী নজরুল ইসলামের নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কে উৎসর্গ করলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। কমরেড মোজাফফর আহমেদ তাকে প্রশ্ন করেছিলেন রাজনীতি করবেন কিনা কাজী নজরুল ইসলামকে স্পষ্ট উত্তর দিলেন রাজনীতির নাই করি যুদ্ধে গিয়েছিলাম কেন। ১৯১৭ সালের যুদ্ধে যোগ দেয়ার সময় সিয়ারসোল রাজ স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র সেখানে তার শিক্ষক সশস্ত্র বিপ্লবী নিবারণচন্দ্র ঘটক এর কাছ থেকে এটাই বুঝে নিলেন বিশ্বপরিস্থিতি নির্ধারণ করে নিলেন ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। সেই সময় বাঙ্গালিরা প্রায় সবাই চাইছিলেন বাঙালি তরুণেরা যুদ্ধে যোগ দিবে তাতে বৃটিশরা সন্তুষ্ট হবে। নজরুল নিজেকে আগামী দিনের ভারতকে স্বাধীনতার লক্ষে রাজনীতিতে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলেন।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের এক রাতে ৩-৪ সি তালতলা, কলকাতা-১৪ লেনের বাড়ির নিচ তলায় দক্ষিণ-পূর্বকোণে ঘরে বসে শেষ রাতে নিবিড় পরিবেশে তিনি ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচনা করেন। বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা তাঁর বন্ধু কমরেড মুজ্জাফর আহমেদ।

বিদ্রোহী কবিতাটিতে ১৪টি ছোট-বড় স্তবক,১৪১টি লাইন বা পংক্তি এবং ১৪৫ বার‘আমি’শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন।আমি ‘আমি’ দ্বারা তিনি হয়তো বুঝাতে চেয়েছেন-ভারত বর্ষের স্বাধীনতাকামী প্রতিটি মানুষের প্রতিনিধি।তিনি কবিতার ভাষায় বলতে চেয়েছেন কারো অধীন হয়ে নয়-বরং আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই মানুষের সার্থকতা। ভাব-ভাষা ও উপমা-ছন্দে বিদ্রোহী কবিতাটি রচিত এক অনবদ্য রচনা। বিদ্রোহী কবিতা যখন তিনি রচনা করেন-তখন ভারতবর্ষে বৃটিশ বিরোধী গান্ধীজির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল এবং এক উত্তাল হাওয়া বিদ্যমান ছিল। গোটা ভারতবর্ষে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল। এর মধ্যেই তার কালজয়ী রচনা‘বিদ্রোহী’। বিদ্রোহী কবিতা রচনা আর কয়েক মাস আগে নজরুলের জীবনে ঘটে বিষাদময় ঘটনা ১৯২১ সাল জুন মাসে কুমিল্লার দৌলতপুরে নার্গিসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় কিন্তু কাবিননামায় শর্ত জুড়ে দিলে নজরুল তা মানতে রাজি হয়নি নার্গিসকে তার পক্ষে নিতে বলেন নাগির্স তার পক্ষে নেয়নি ঐদিন বাসর রাতেই নজরুল দৌলতপুর থেকে কুমিল্লা চলে আসে ওখান থেকে পরদিন কলকাতায় ট্রেনযোগে রওয়ানা হয় এ বছর ডিসেম্বরের এক গভীর রাতে তার ঘুম ভাঙ্গে তিনি জীবনের ঘটনা ভারতবর্ষের ঘটনা তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে তারপর তিনি লেখেন এই বিদ্রোহী কবিতা, বল বীর উন্নত মম শির ওই শিখর হিমাদ্রির। এই বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশ হলে ভারতবর্ষের নজরুলের ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে রাজনীতিবিদদের একটি শ্লোগান মুখে মুখে বলতে থাকে, বীর উন্নত মম শির ওই শিখর হিমাদ্রির, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এই কবিতাটি ছিল তার প্রথম ম্যাসেজ।